শিক্ষকের কাজ শিক্ষাদান

শিক্ষকের কাজ শিক্ষাদান:
চাল ডাল পরিমাপ প্যাকেটজাতকরা বিতরণ - শিক্ষকের কাজ নয় অবিলম্বে তাঁদের এই কাজ থেকে মুক্তি দেওয়া হোক।

পৃথিবীর সবচেয়ে মহৎ দান শিক্ষাদান। মহান শিক্ষকগণ আমাদের শেখান, বুঝিয়ে দেন, ভাষা থেকে সংস্কৃতি কৃষ্টি ঐতিহ্য ইতিহাস ভূগোল বিজ্ঞান মানব-জীবনাচরণ আদর্শবাদ অর্থনীতি রাজনীতি ও হরেক সমস্যার সমাধানের উপায়।  তাঁদের হাতেই মানবজমিন কর্ষিত হয়ে চলেছে আবহমান যুগ ধরে।  তাঁরাই গড়ে তোলেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে।  এই পৃথিবীর ভবিষ্যৎ মাতা-পিতাদের শিশুকাল তাঁদের হাতেই লালিত পালিত হয়।

আমরা যারা ছাত্র-ছাত্রী, অভিভাবক-অভিভাবিকা; তারা শিক্ষকদের সর্বোচ্চ সম্মানের আসনে বসাতে চাই, তাঁদের আশীর্বাদ পেতে চাই। বিদ্যালয় যেমন আমাদের দ্বিতীয় গৃহ; তেমনি শিক্ষক শিক্ষিকাগণ আমাদের পিতা মাতার আসনে বিরাজ করেন।

কিন্তু বর্তমানে, এই করোনাকালে, মার্চ ২০২০ থেকে প্রায় ১৫ মাস যাবত, আমাদের দেশের অন্তত আমাদের রাজ্যের বেশিরভাগ শিক্ষকগণ চাল আলু চিনি মুসুরির ডাল পরিমাপে এবং বিতরনে ব্যস্ত। "কোন কাজই ছোট নয়" একথা শিক্ষকরাই আমাদের মনের মধ্যে গেঁথে দেন।  তাই অবশ্যই চাল ডাল আলু চিনি ওজন করে প্যাকেটজাত করা এবং তা বিতরণ করা মোটেও ছোট কাজ নয়; কিন্তু পাশাপাশি এটি শিক্ষকের কাজ‌ও নয়।  

সরাসরি দাবি তুলতে চাই: 

চাল ছোলা ডাল আলু চিনি কেনা, পরিমাপ, প্যাকেটজাতকরা ও বিতরণ শিক্ষকের কাজ নয়। অবিলম্বে এই কাজ থেকে শিক্ষকদের মুক্তি দেওয়া হোক।

কারণ, এটা শিক্ষকের কাজ নয়। তাঁদের কাজ শিক্ষাদান করা; কুসুম মতি ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষিত করে তুলে কঠোর বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করানো। কাঁচা সোনা পাকা লোহায় পরিণত করা। 

তাঁদের দিয়ে নির্বাচন সহ অন্যান্য অনেক সামাজিক সমীক্ষা ও পরিসংখ্যানের কাজ তো এমনিতেই করানো হয়; তাতেও পঠন-পাঠনের ও গবেষণার ক্ষতি হয় যথেষ্ট।  এরপরেও যদি তাদেরকে চাল আলু পরিমাপে ও বিতরণে সময় ব্যয় করতে হয় তাহলে মানবসম্পদের অবনমন হতে বাধ্য।

প্রয়োজনে স্বনির্ভর গোষ্ঠী গুলিকে এই দায়িত্ব দেওয়া যেতেই পারে। তারাই চাল ছোলা ডাল আলু চিনি কেনা পরিমাপ ও বিতরণ করতে পারবে।  সম্ভবত এই বিতরনের সবচেয়ে সুষ্ঠু সমাধান এভাবেই হতে পারে।

শিক্ষকের_কাজ_শিক্ষাদান:

মার্চ ২০২০ থেকেই, এ বঙ্গের সমস্ত স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ।  মাঝে কিছুদিন নবম দশম একাদশ দ্বাদশ শ্রেণির পঠন-পাঠন সম্ভবত শুরু হয়েছিল, কিন্তু কয়েক মাস পরেই আবার বন্ধ হয়ে গেছে।  এই সুদীর্ঘ ১৫ মাস ছাত্র-ছাত্রীরা সম্পূর্ণভাবে স্কুল শিক্ষা থেকে বঞ্চিত।  সম্ভবত অনেকেই তাদের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের চেহারাও ভুলে গেছে। এভাবেই তারা এক ক্লাস থেকে অপর ক্লাসে বিনা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ‌ হয়ে গেছে। স্কুল শিক্ষকদের সঙ্গে তাদের আর কোনো যোগাযোগ নেই।

এমতাবস্থায়, অবিলম্বে, বিকল্প পদ্ধতিতে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কথোপকথন এবং শিক্ষা পদ্ধতি প্রচলনের দাবি জানাচ্ছি।

করোনাকালে বিকল্প পদ্ধতিতে শিক্ষাদান:

১.  গুগোল ক্লাসরুম ও গুগোল মিটের মাধ্যমে অত্যন্ত সুন্দরভাবে ক্লাস নেওয়া সম্ভব, যাদের কম্পিউটার বা স্মার্টফোন রয়েছে সে সমস্ত ছাত্র-ছাত্রীদের।  এই পদ্ধতিতে সেন্ট্রাল স্কুল বিগত ১৫ মাস ধরেই প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ ঘন্টা ক্লাস চালিয়ে যাচ্ছে।  বেসরকারি স্কুলগুলিও এই পদ্ধতি মেনে চলছে।

২.  হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ বানিয়ে শিক্ষক-শিক্ষিকা গণ অনায়াসে ছাত্র ছাত্রীদের সঙ্গে নিরন্তর আলাপ আলোচনা চালিয়ে যেতে পারেন।  যা ক্লাস রুমের থেকে কোন অংশেই কম হবে না।

৩.  শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ স্কুলের বিভিন্ন পাঠ্যক্রমের উপর ভিত্তি করে অডিও ও ভিডিও প্রেসেনটেশন তৈরি করুন।  সেগুলি স্কুলের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ বা অন্যান্য সামাজিক মাধ্যম গ্রুপে আপলোড করুন।  ফ্রিকুয়েন্টলি আস্কড কুয়েশচেনস-এর তালিকা তৈরি করে সেই বিষয়ে অডিও-ভিডিও প্রেসেনটেশন তৈরি করা যেতেই পারে।  সেগুলি ছড়িয়ে দিলে ছাত্রছাত্রীরা কিন্তু বারবার সেগুলি দেখার সুযোগ পাবে।  ধরা যাক কোন একটি কবিতা বা গল্প বা বিজ্ঞানের কোন একটি বিষয় যেটি শিক্ষক ক্লাশে ব্যাখ্যা করেন সেটি যদি অডিও ভিডিও মাধ্যমে রেকর্ড করে নেওয়া যায় এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করা যায় সেই স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে তাহলে তারা বারবার অডিওটি ভিডিওটি দেখে শুনে নিজেদের তৈরি করতে পারবে এবং এটা সম্ভব ও অত্যন্ত ফলপ্রসূ।

৪.  যে সমস্ত ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে কম্পিউটার বা স্মার্টফোন নেই, তবে একটি সাধারণ ফোন আছে; শিক্ষক-শিক্ষিকা গণ নিয়ম করে প্রতি সপ্তাহে তাদের সঙ্গে ফোনে কথা বলুন। উৎসাহিত করুন বাড়িতে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে, তাদের জিজ্ঞেস করুন তাদের সমস্যা কোথায়, এবং ফোনালাপের মাধ্যমে তাদের সমস্যার সমাধান করুন।  এই যুগে ফোন কিন্তু সকলের কাছেই আছে।

যাদের এমনকি একটি সাধারণ ফোন‌ও নেই তাদের জন্য:

৫. প্রতিমাসে নির্দিষ্ট দিনে অভিভাবক অভিভাবিকা গনকে স্কুলে ডেকে পাঠিয়ে তাদের হাতে ছাপানো একমাসের হোম ওয়ার্ক (প্রজেক্ট ওয়ার্ক, প্রশ্নমালা) তুলে দেওয়া হোক যা পরের মাসে ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে নিয়ে এসে অভিভাবক-অভিভাবিকা গণ শিক্ষক-শিক্ষিকাদের হাতে জমা দেবেন।  এ পদ্ধতিতেও কিন্তু ক্লাস চলতে থাকবে, খুব খারাপ যে হবে তা নয়।  ছাত্র-ছাত্রীদের এক মাসের পড়াশোনার পরিকল্পনা এভাবে তৈরি করে দিলে ছাত্র-ছাত্রীরা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবে।  আমার স্মৃতিতে আমার ছেলে মেয়ের স্কুলে একবারই এভাবে ছাপানো প্রশ্নপত্র এবং প্রজেক্ট ওয়ার্ক অভিভাবকদের হাতে দেওয়া হয়েছিল।  কেন প্রতি মাসে হবে না?

আমার সকল শিক্ষক-শিক্ষিকা বন্ধু-বান্ধবের মতামতের অপেক্ষায় রইলাম। এই ভয়ঙ্কর সময় পার করতে গিয়ে আমরা যেন আমাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে না ফেলি।

অরিন্দম চন্দ্র

Comments

Popular posts from this blog

My first 'talk'

The art of public speaking

A list of Most Useful Proverbs